নওগাঁপ্রবাসজীবনবিশেষসংবাদসারা দেশ

স্বচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে সৌদি, ফিরলেন কফিনে—ঋণের বোঝায় দিশেহারা পরিবার

নওগাঁ প্রতিনিধি

পরিবারের সচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে কেউ ভিটেমাটি বন্ধক রেখে, কেউ আবার চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। স্বপ্ন ছিল, বিদেশের আয় দিয়ে সংসারের অভাব ঘোচাবেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ প্রায় পৌনে তিন মাস পর দেশে ফিরেছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নওগাঁয় এবং দুজনের নাটোরে। স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো।

নিহত নওগাঁর পাঁচজন হলেন—আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব ও সাধনগর গ্রামের সাগর আলী এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে একে একে তাঁদের মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। সন্ধ্যায় জানাজা শেষে তাঁদের নিজ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এর আগে শনিবার সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবে নিহত সাতজনের মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে সেগুলো নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। দুর্ঘটনার পর গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হয়। তবে আগুনে পুড়ে মরদেহের চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় বাকিদের পরিচয় শনাক্তে জটিলতা দেখা দেয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করে কর্তৃপক্ষ। প্রায় পৌনে তিন মাসের অপেক্ষার পর বাকি সাতজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলো।

স্বজনেরা জানান, নিহতদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সংসারের অভাব ঘোচাতে ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে তাঁরা বিদেশে গিয়েছিলেন। এজন্য কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, কেউ এনজিও কিংবা ব্যক্তির কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ করেছেন। বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরতে হলো কফিনবন্দি হয়ে।

নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ, আত্রাই উপজেলার মাধবপুর, সাধনগর ও মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের পথে প্রবেশ করতেই স্বজন ও প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন। অ্যাম্বুলেন্স থামার পর শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখার জন্য ছুটে আসেন তাঁরা। কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ কফিন আঁকড়ে ধরে বিলাপ করতে থাকেন।

পার-নওগাঁ এলাকার নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগমের আহাজারিতে উপস্থিত লোকজনও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘তিন মাস আগে এনজিও থ্যাক ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে ছাওয়ালটাকে বিদেশ পাঠাইছিলাম। আগুনে হামার সব শ্যাষ হয়ে গেল। শাহিনের ছোট ছোট দুইটা ছাওয়াল, ওগুলা এখন কী খাইবে। আর এত টাকা ঋণ আমরা কীভাবে শোধ করমু।’

আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ছেলে তাঁকে বলেছিলেন, কারখানায় কাজ পেয়েছেন। দুই বছর পর বাড়ি ফিরবেন। আজ ছেলে ফিরেছেন, কিন্তু তাঁর দেহে প্রাণ নেই।

ছেলের উপার্জনে জীবনের শেষ সময়ে একটু স্বস্তিতে দিন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন বৃদ্ধ বাবা মজনু সরদার। ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে তিনি বলেন, ‘ভাবছিলাম জীবনের শেষ বয়সে ছাওয়াল সুখের দিন আনবে। তা না হয়ে এই বয়সে এসে নিজের হাতে ছেলের কফিন নামাতে হলো। এই শোক সহ্যের ক্ষমতা আমার নেই।’

একই চিত্র সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর পরিবারে। সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন পারভীন খাতুন। স্বামীর আয়ে সংসারের অভাব ঘুচবে, দুই সন্তানকে নিয়ে ভালো থাকবেন—এমন স্বপ্ন ছিল তাঁর। এখন দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে স্বামী হারানোর শোকের পাশাপাশি ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা তিনি। পারভীন বলেন, ‘ঘরে দুইটা অবুঝ বাচ্চা, ঋণের এক টাকাও শোধ হয় নাই। ওদের নিয়ে এখন আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব।’

পাঠকের কাগজ

এদিকে নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিটি পরিবারকে ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে আত্রাই উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, তিন মাস পর সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তিন লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও বিনা খরচে মরদেহগুলো নিহতদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

নওগাঁর পাঁচজন ছাড়াও নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির হোসেনের মরদেহ একই সঙ্গে দেশে ফেরে। শনিবার সন্ধ্যায় নিজ নিজ গ্রামে জানাজা শেষে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

Related Articles

Back to top button