প্রসঙ্গ

শিক্ষার আয়নায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ: প্রতিষ্ঠান আছে, শিক্ষা কোথায়?

শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। একটি জেলার উন্নয়ন, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা মানুষের জীবনমান—সবকিছুর সঙ্গেই শিক্ষার সম্পর্ক গভীর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে?

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে গভীরভাবে তাকালে সাফল্যের পাশাপাশি এমন কিছু প্রশ্ন সামনে আসে, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, পরীক্ষার ফলাফলও কোনো কোনো বছর আশাব্যঞ্জক হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত মান কি সেই অনুপাতে বাড়ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দেখলে চলবে না। দেখতে হবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পাঠদানের মান, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, অর্থের যথাযথ ব্যবহার, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীর নৈতিক ও মানবিক বিকাশ।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী কোথায়?

শিক্ষার প্রথম শর্ত হলো শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়া যেন কেবল পরীক্ষার আগে একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না হয়ে কোচিং বা প্রাইভেটনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক।

শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির পাশাপাশি শিক্ষকের উপস্থিতি ও পাঠদানের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষক যদি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে না থাকেন, কিংবা উপস্থিত থেকেও কার্যকর পাঠদান না করেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে শুধু একটি ভবনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শিক্ষার প্রাণ হলো শ্রেণিকক্ষ। শ্রেণিকক্ষ নিষ্প্রাণ হলে সুন্দর ভবন, সাইনবোর্ড কিংবা পরীক্ষার ফলাফল কোনোটিই শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি বিদ্যালয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ হিসেবে পর্যাপ্ত পাঠদান না হওয়ার কারণে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ধরনের অভিযোগ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।

প্রাইভেট ও কোচিং কি বিদ্যালয়ের বিকল্প?

প্রাইভেট ও কোচিং এখন অনেক পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে। অভিভাবকেরা সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর পাশাপাশি আবার আলাদা অর্থ ব্যয় করে একই বিষয় পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

যদি বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ে একজন শিক্ষার্থী তার পাঠ বুঝে নিতে না পারে, তাহলে এর দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়; প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসন—সবারই রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থী কি বিদ্যালয়ে যথাযথ শিক্ষা পাচ্ছে, নাকি বিদ্যালয়ের বাইরে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা কিনতে বাধ্য হচ্ছে?

প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু জবাবদিহি কতটা?

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে জেলার ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

এটি কোনো ছোট বিষয় নয়। কারণ, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম মানে শুধু হিসাবের খাতায় অসংগতি নয়; এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপরও।

বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ যথাযথভাবে ব্যয় না হলে শ্রেণিকক্ষ, পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, খেলাধুলা, শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষার্থীদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয়; এটি মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম মৌলিক শর্ত।

অভিযোগ উঠলেই অপরাধী নয়, তদন্তই শেষ কথা

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি। কোনো শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী বলা যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে, নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের ঘটনাগুলো দেখায়, এ ধরনের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

যেমন, শিবগঞ্জে একজন শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরুর খবর প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, নাচোলের একটি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়ার ঘটনাও সংবাদে এসেছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ। জনমত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।

পরীক্ষার ফলাফল কি শিক্ষার প্রকৃত মানের আয়না?

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু এটিই শিক্ষার একমাত্র মাপকাঠি নয়।

একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেই কি সে সৎ, মানবিক, দায়িত্বশীল ও যুক্তিবাদী নাগরিক হয়ে ওঠে? উত্তর অবশ্যই না।

পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া জরুরি। তবে এর পাশাপাশি প্রয়োজন চিন্তা করার ক্ষমতা, প্রশ্ন করার সাহস, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার অভ্যাস, অন্যের প্রতি সম্মান, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ।

আমরা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উল্লাস করি, কিন্তু শিক্ষার্থীদের আচরণ, মূল্যবোধ ও মানবিক বিকাশ নিয়ে কতটা আলোচনা করি?

নৈতিক অবক্ষয়: পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়

বর্তমান প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে উঠছে। হাতে স্মার্টফোন, সামনে অসীম তথ্যের ভান্ডার। কিন্তু তথ্য আর শিক্ষা এক বিষয় নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অশালীন কনটেন্ট, অনলাইন আসক্তি, সহিংসতার সংস্কৃতি, মাদক এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো সমস্যা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

শুধু শিক্ষার্থীকে দোষারোপ করে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ একজন শিক্ষার্থী সমাজের বাইরে বেড়ে ওঠে না। সে পরিবার দেখে, শিক্ষক দেখে, রাজনীতি দেখে, সামাজিক আচরণ দেখে এবং চারপাশের অনিয়ম-দুর্নীতিও প্রত্যক্ষ করে।

বড়রা যদি নিয়ম ভাঙাকে স্বাভাবিক করে তোলেন, তাহলে ছোটদের কাছ থেকে নৈতিকতা প্রত্যাশা করা কঠিন। শিশুকে আমরা যা বলি, তার চেয়ে আমাদের আচরণ দেখে সে অনেক বেশি শেখে।

শিক্ষকের মর্যাদা ও দায়িত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে

শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরি নয়; এটি একটি মহান সামাজিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিক্ষককে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের জন্য দায়ী করলে চলবে না। একজন শিক্ষককে বুঝতে হবে, তাঁর শিক্ষার্থী কেন শ্রেণিকক্ষে আসছে না, কেন পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে, কেন অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে কিংবা কেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যদি শুধু উপস্থিতির খাতা ও পরীক্ষার নম্বরে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শিক্ষার মানবিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।

অভিভাবকের ভূমিকাও কম নয়

অনেক অভিভাবক সন্তানের ভালো ফলাফলকেই শিক্ষার একমাত্র সাফল্য মনে করেন। সন্তান জিপিএ-৫ পেলেই যেন সব ঠিক। কিন্তু সন্তান মিথ্যা বলছে কি না, অন্যকে সম্মান করছে কি না, বই পড়ছে কি না, মানুষের কষ্ট বুঝতে পারছে কি না কিংবা সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানের ওপর শুধু ভালো ফলাফলের চাপ না দিয়ে তার নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে অভিভাবকদের সময় দিতে হবে।

শিক্ষা প্রশাসনের করণীয় কী?

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।

প্রথমত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভব হলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেন, উন্নয়ন বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, কোনো অভিযোগ উঠলে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নিয়মতান্ত্রিক তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।

চতুর্থত, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করে অপ্রয়োজনীয় কোচিংনির্ভরতা কমাতে হবে।

পঞ্চমত, শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, আচরণ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ষষ্ঠত, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সপ্তমত, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা কিংবা পরিচয় বিবেচনা না করে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

শেষ কথা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে—এ কথা বলা যেমন সত্য নয়, তেমনি সবকিছু ভালো চলছে, সেটিও বলা যাবে না। এই জেলার অসংখ্য শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। হাজার হাজার শিক্ষার্থী কঠোর পরিশ্রম করছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভালো ফলাফল ও সুনামও ধরে রেখেছে।

কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা, শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত কোচিংনির্ভরতা এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক সংকট পুরো ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তৈরি করছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন বড় করলেই শিক্ষা বড় হয় না। পরীক্ষার ফল ভালো হলেই একটি জাতি প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠে না। জিপিএ-৫ বাড়লেই মানুষের মানবিক গুণাবলি বাড়ে না।

শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে বলতে পারে—‘আমি শুধু পরীক্ষায় পাস করিনি; আমি একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও পেয়েছি।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি শুধু সার্টিফিকেট তৈরি করছি, নাকি মানুষ তৈরি করছি?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াই আগামী দিনের চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

লেখক : মোহা. শফিকুল ইসলাম
সহকারী অধ্যাপক, বিনোদপুর কলেজ

Back to top button