
“কি আশায় বাঁধি খেলাঘর
বেদনার বালুচরে
নিয়তি আমার ভাগ্য লয়ে যে
নিশি দিন খেলা করে।।”
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথা,
শ্যামল মিত্রর সুর এবং কিশোর কুমারের কন্ঠে নিদারুণ এই গানটি গাওয়া হয়েছিল ১৯৭৪ সালে “অমানুষ” বাংলা সিনেমায়। অর্ধশতাব্দীর পরেও এ গান পদ্মাচরের মানুষের হৃদয়ে গুনগুন করে বেজে ওঠে প্রতিনিয়ত!
জন্মলগ্ন থেকেই পদ্মাচরের মানুষের ভাঙ্গাগড়ার জীবন। পদ্মানদীর গর্ভে বারবার বিলীন হয় বসতভিটে ও আবাদি জমি। প্রকৃতপক্ষে জাতীয় পরিচয় পত্র বা জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী স্থায়ী ঠিকানায় বাস করতে পারেন না তারা। কয়েকবছরের ব্যবধানে ঠিকানার পরিবর্তন হয়ে যায়। তবুও নাড়ীর টানে এখনো মানুষ নিরাশায় বাঁধেন খেলাঘর বেদনার ঐ বালুচরেই। কিন্ত এদের স্থায়ী বাসস্থান ও স্থায়ী ঠিকানার ব্যবস্থা করা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? এদের জীবনমান কি দেশের সার্বিক উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখেনা?
ভারতের ভাগীরথী নদী বাংলাদেশের পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। এই পদ্মা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে পাঁচ শতাধিক বছর আগে জনবসতি গড়ে উঠেছে। নদীর সাথে পাল্লা দিয়ে ভাঙা-গড়ার জীবন চলছে তাদের। কালের আবর্তে বিভিন্ন শাসনামলের আওতায় ছিল এ চরাঞ্চলটি। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকেই বৃটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলের কথাও বলতে পারেন। সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৫৫ বছর। এখন ডিজিটাল শিল্পায়নের যুগ। আমরা বিশ্বব্যাপী এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেপড়ে লেগেছি। মধ্যম আয়ের সভ্য জাতিতে উন্নিত হওয়ার যুদ্ধ করছি। কিন্তু চরাঞ্চলের ৫০ হাজার মানুষের ভাগ্য নির্ভর করছে প্রকৃতির উপরই। নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হবে হচ্ছে শুনতে শুনতে হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি পদ্মার বুকে হারিয়ে গেছে। এলাকাছাড়া হচ্ছে মানুষ। ফলে চরাঞ্চলের ভৌগলিক, সামাজিকসহ সার্বিক পরিবেশ তলানিতে নেমে যাচ্ছে!
এ পদ্মানদীর অববাহিকায় ৪টি ইউনিয়নের অবস্থান। সেগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়নপুর, শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর, পাঁকা ও দুর্লভপুর। ইতিমধ্যে উজিরপুর ইউনিয়নের ভূখণ্ড ৭০% শতাংশই পদ্মার গর্ভে বিলীন। ঐ ইউনিয়নের মানুষ এখন বিভিন্ন ইউনিয়ন ও উপজেলায় বাস করছেন। শুধু কাগজে কলমে ইউনিয়নে অস্তিত্ব দেখা যায় কিন্তু বাস্তবে তা ধু-ধু বালুচর।
সম্প্রতি জানা গেছে, উজিরপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ আবাদি জমি দীর্ঘদিন বালুচরে পরিনত হয়ে থাকায় কয়েক হাজার বিঘা জমির খাজনা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস। এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে জনমনে। মানববন্ধনও করেছেন তারা। তাতেও কোনো সুরাহা হয়নি।
উজিরপুর ইউনিয়নের সাবেক বাসিন্দা মুসলেমা বেগম (৪৫)। ঐ ইউনিয়নের রাধাকান্তপুর এলাকায় বাস করতেন। একই এলাকায় বাবা ও শ্বশুর বাড়ি ছিল। আনুমানিক ২০ বছর আগে পদ্মানদীর গর্ভে এলাকাটি সম্পূর্ণ বিলীন হলে নিরুপায় হয়ে পড়েন দুই পরিবার। ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি তলিয়ে যায় পানির নিচে। নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধ মা, এক শিশু সন্তান ও স্বামী সহ আশ্রয় নেন পাঁকা ইউনিয়নের চরপাঁকা জামাইপাড়া গ্রামে। বাঁশ খড় দিয়ে ঘর বাঁধেন সেখানে। মুসলেমা বেগমের স্বামী বাবুল আকতার দিনমজুরী করে সামান্য উপার্জন করে। মুসলেমা বেগম অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ধর্মপ্রাণ নারী। সে সেলাইয়ের কাজ করা শুরু করেন ঘরে বসে। অল্প অল্প টাকা জমিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনে উপার্জন বাড়ান। ইতিমধ্যে পরিবারটি পাঁকা ইউনিয়নের ভোলার তালিকাভুক্ত হয়। ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান এডভোকেট আতাউর রহমান পরিবারটিকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। পাঁকা চরাঞ্চলে এসে ২০ বছরের মধ্যে তিনবার বসতভিটা নদীগর্ভে পতিত হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ভাঙ্গনের মুখোমুখি হয়। বাড়ি করার মত এলাকায় জমি জায়গা ব্যবস্থা করতে বার্থ হয়। আবার নিরুপায় হয়ে ঐ পরিবারটি পাঁকা ইউনিয়ন ছাড়তে বাধ্য হয়। অবশেষে আশ্রয় নিয়েছে অত্র জেলার রানীহাটি ইউনিয়নের সরকারি গুচ্ছগ্রাম সংলগ্ন একটি আম বাগানে।
মুসলেমা বেগম জানান, “রাধাকান্তপুরের প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন হারিয়ে পাঁকা ইউনিয়নে আশ্রয় নিয়েছিলাম। দীর্ঘদিন ঐ এলাকায় বাস করতে লেগে সবাইকে আপন করে নিয়েছিলাম। কিন্তু নদীর ভাঙ্গনে সে সুখ আর ঠিকলো না। আবার সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। প্রতিবেশীদের ভালবাসার কথা ভুলতে পারিনা। তারপরও মনে শান্তনা দিই যে আর বাড়িঘর ভাঙতে হবে না।” এরকমভাবে গত বছর কয়েকশো পরিবার ঠিকানা হারা হয়ে চরাঞ্চল ছেড়ে অন্যাত্র আশ্রয় নিয়েছেন।
পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আব্দুল মালেক বুদ্ধু। সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে এলাকায় তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। সর্বশেষ বাস করছিলেন পাকাঁ ইউনিয়নের চরাঞ্চলে কদমতলা গ্রামে। গত বছর ব্যপক নদী ভাঙ্গন শুরু কলে দিশেহারা হয়ে পড়েন। বারবার বসত বাড়ি স্থানান্তর করতে করতে এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে চরাঞ্চলের ঘরবাড়ির ভগ্নাংশ নিয়ে নাচোল উপজেলার পন্ডিতপুরে চলে যান। এলাকা থেকে বিদায় হওয়ার মুহুর্তে প্রতিবেশী ও পরিবারের মানুষ অশ্রুসিক্ত হন আবেগে ও আপনজন ছেড়ে যাওয়ার বেদনায়।
এলাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে আব্দুল খালেক বুদ্ধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অনুভূতি প্রকাশ করেন।
“প্রিয় এলাকাবাসী ও সম্মানিত আত্মীয়স্বজন, আসসালামু আলাইকুম।
নদী ভাঙন ও পারিবারিক কারণে আমি আমার বসতবাড়ি ভেঙে অন্যত্র চলে যাচ্ছি। এই সিদ্ধান্ত আমার জন্য খুবই কষ্টের। ১২নং পাঁকা ইউনিয়নের আপনাদের সবার সাথে কাটানো সময়, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা আমি কখনো ভুলতে পারব না। বিশেষ করে ৯ নং ওয়ার্ডের আপনাদের যে ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছি, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। একজন সাবেক মেম্বার হিসেবে সবসময় চেষ্টা করেছি আপনাদের পাশে থাকতে। যদি কোনো সময় কোনো ভুল বা কষ্ট দিয়ে থাকি, দয়া করে ক্ষমা করে দেবেন। আপনাদের সবার জন্য রইলো দোয়া ও ভালোবাসা। আমার জন্যও দোয়া করবেন, যেন নতুন জায়গায় ভালো থাকতে পারি।”
বিদায় মুহুর্তে তার বড় ছেলে শাহালাল জানান, “আজ আমার মনটা যেনো ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলো। সবাই থেকে গেলো আমি যেনো সবার মাঝ থেকে হারিয়ে গেলাম।” পৈতৃক ভিটা বারবার নদীতে হারিয়ে নাচোল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হাজারেরও অধিক পরিবার বসবাস শুরু করেছেন।
পাঁকা ইউনিয়নের গমের চর গ্রামের কৃষক মো. একরামুল হক (৬৬) বলেন, “আমার মনে পড়তে কমপক্ষে ২০বার ঘরবাড়ি ভেঙেছে পদ্মার ভাঙ্গনে। দুবছর হলো বাড়ি ভেঙেছে। এবার বর্ষার শুরুতেই নদী ভাঙ্গনও শুরু হয়েছে। আবার বাড়িঘর ভেঙতে হলো। এখনো ঘর-দুয়ার ঠিক করতে পারিনি। আমার বড় ছেলে টুটুল নদীভাঙনে অতিষ্ঠ হয়ে উজিরপুর জলবাজার এলাকায় বাড়ি নিয়ে গেছে গত বছর। আমার এক বোন শাহিন বেগম তার পরিবার নিয়ে চলে গেছে তর্তিপুর শেখটোলায়। আমার আরেক ভাগনে পরিবার সহ শেখটোলায় বাড়ি করেছে। এরকম ভাবে যে যেদিকে সুযোগ পাচ্ছে সেদিকেই চলে যাচ্ছে। আবাদের মতো জোত-জমিও আর নাই। ফেরীআলা বা রাজমিস্ত্রীর কাজ করার জন্য মানুষ বেশি চলে যাচ্ছে। “
হলদিবোনা হাটের সুপরিচিত দোকানদার মো. ইব্রাহিম হোসেন সম্প্রতি বাড়িঘর স্থানান্তর করে নাচোল উপজেলার ভোলা মোড়ে নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ” চরে বাড়ি করার মতো আর জায়গা পাইনি। কি করবো, কতোবার বাড়ি ভাঙব? নিরুপায় হয়ে এলাকা ছাড়তে হল।”
স্থানীয় এক ছাত্র কবির হোসেন জানান, “বিগত পাঁচ বছরে কয়েকবার ভরপুর বর্ষায় নদীভাঙন মুহুর্তে অস্থায়ী জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হয়েছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে কিন্তু এলাকাবাসীর কোন উপকার হয়নি। আমাদের বহুদিনে প্রত্যাশা নদীভাঙ্গন প্রতিরোধ করা হোক স্থায়ীভাবে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়নপুর, পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়নের কয়েকশো পরিবার নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আমনুরা এলাকায় ঠাঁই নিয়েছেন। এর ফলে আমনুরা বাইপাস রেল স্টেশনের সামনে গড়ে উঠেছে কয়েকটি গ্রাম। এছাড়া আমনুরা কলেজ মোড়ের আশেপাশেও কিছু পরিবার বাস করছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জ পৌরসভার অধীনে সহস্রাধিক পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। যারা মোটামুটি সচ্ছল তারা সাধারণত শহরের বাসিন্দা হয়েছেন। নারায়ণপুরের কিছু পরিবার বহু আগেই রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় বাড়ি করে বাস করছেন। দিনাজপুর জেলার বিরল ও কাহারোল উপজেলায় কয়েক হাজার মানুষ বাস করেন তাদের পুর্বপুরুষেরা ছিলেন চরাঞ্চলের বাসিন্দা। জীবিকার টানে গিয়ে খাগড়াছড়িতেও কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে। ১৯৪৫ সালের ভয়াবহ বন্যার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অন্তত পনেরো হাজার পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সে হিসেবে বলা যায় পদ্মা নদীর তীরবর্তী অধিকাংশ পরিবারই নিজ এলাকা ছেড়ে ভিন্ন উপজেলা ও জেলায় ঘর বেঁধেছেন।
এবার বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ বসতভিটে হারানোর আতঙ্ক নিয়ে অনিশ্চিত দিন কাটাচ্ছেন। ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে দুই শতাধিক বাড়ি ও শতাধিক বিঘা আবাদি জমি।
স্থানীয় জরিপ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পদ্মানদীতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ নদীভাঙন হয়েছে। বিলীন হয়েছে হাজারো পরিবারের ঘরবাড়ি ও ফসলের মাঠ। এর মধ্যে অন্তত ৫শো পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তারা অধিকাংশই নাচোল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই শিবগঞ্জ, রানীহাটি, বিনোদপুর, আটরশিয়া ও সদর উপজেলার আমনুরা, বাবুডাইং, সুন্দরপুর সহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাস করছেন। পদ্মার খরস্রোতে তলিয়ে গেছে দক্ষিণ পাঁকা, তেরো রশিয়া, ডুবাইপাডা, গমের চর, জামাই পাড়া, সরদার পাড়া, হাট পাড়া, মারাঙা পাড়া, হিন্দু পাড়া সহ প্রায় ১৫টি গ্রাম। নদীতে ভেঙে গেছে পাঁকা-নারায়নপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়, পাঁকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর পাঁকা সরদার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গমের চর প্রাথমিক বিদ্যালয় , হলদিবোনা হাট, তেলিখাড়ি হাট, গমের চর কবরস্থান, চর পাঁকা ঈদগাহ সহ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ, মন্দির প্রভৃতি। বিলীন হওয়া আবাদি জমি পরিমাণ এক হাজার হেক্টর। ৫ বছরের অত্র এলাকায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২শো কোটি টাকা। বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে প্রায় ৫০টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ৫টি বিজিবি ক্যাম্প, স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, ৪টি হাট-বাজার, ৩টি কবরস্থান ও কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি।
স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে পদ্মা নদীর পুর্বপাড়ে তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। তখন সরকার পূর্বপাড়ে ৭টি “আই” সদৃশ বাঁধ নির্মাণ করেছিল। এরমধ্যে ১ নম্বর বাঁধ বা স্পারের পার্শ্ববর্তী এলাকা নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায় কয়েক বছরের মধ্যেই। ঐ এক নম্বর বাঁধ এখন পদ্মানদী গর্ভে মধ্যভাগে দাঁড়িয়ে আছে। এরপর থেকে বহুবার নদীভাঙন প্রতিরোধে বাঁধ নির্মাণের জন্য আবেদন জানিয়েছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, এ অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারই অন্তত ২০ থেকে ২৫ বার নদীভাঙনে বসতভিটে হারিয়েছে। ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশের দুর্লভপুর ইউনিয়নের যে স্থানে পদ্মা নাম ধারণ করেছে সেই মোহনা স্থল থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। ভারি বর্ষায় যখন পাহাড়ি ঢল নেমে আসে তখন ফারাক্কা বাঁধের শতাধিক গেট খুলে দেয়া হয়। তখন পদ্মা আরো বেশি খরস্রোতা হয়ে উঠে। শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন। তবে বিগত কয়েকবছরে নদীভাঙনের গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে। অতিরিক্ত বর্ষা ও বন্যা ছাড়াও আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত নদীভাঙন অনবরত চলছে। ফলে এলাকাবাসী হতাশ ও আতঙ্কিত।
# পাঁকা ইউনিয়নের দুইবারের সাবেক চেয়ারম্যান এডভোকেট আতাউর রহমান(৭৬) বলেন, “গত এক বছরের মধ্যে দুইবার আমার বসতভিটে নদীতে বিলীন হলো। গত কয়েক বছর থেকে যেরকম নদীভাঙ্গন হচ্ছে এরকম ভাঙ্গন আমার এর আগে আমি কখনো দেখিনি। এখন চরাঞ্চলের কোন এলাকা আর নিরাপদ না। সবাই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। যেকোনো সময় যেকোনো এলাকা ভাঙনের কবলে পড়তে পারে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে হয়তো পাঁকা চর সম্পুর্ন বিলীন হয়ে যাবে। তবে আমরা শুনছি নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি সঠিক সময়ে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হলে নদীভাঙনের কবল থেকে হাজার হাজার পরিবারের ঠিকানা স্থায়ী করা সম্ভব। এতে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। এলাকায় সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি পাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম জানান, “শিবগঞ্জ উপজেলায় পাদ্মা নদীর পূর্বপাড়ের ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। ডেন্টারের কাজেও প্রায় শেষ। ৭৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মাঠে নামবেন দুই সপ্তাহের মধ্যে। পরবর্তীতে নদীর পশ্চিম পাড়ে বাঁধ নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকার পদ্মানদীর দুই পাড়েই পর্যায়ক্রমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে জনগণের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করে দিবে।”
শিকড়ের সম্পর্ক ছেড়ে যাওয়ার যে বেদনা তা দূর থেকে উপলব্ধি করা যায়না শুধু অনুমান করা যায়। যারা এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন শুধু তারাই বুঝবেন এর যন্ত্রণা। তবে জন্মান্তরের মায়া ছাড়তে হলেও বড় সান্ত্বনা হলো, মৃত্যুর পর অন্তত কবরস্থানের চিহ্নটুকু স্মরণীয় হয়ে থাকবে স্বজনদের কাছে।
ঠিকানাহীন মানুষের সবচেয়ে বড় বেদনা শুধু ঘর হারানো নয়; হারিয়ে যায় শিকড়, স্মৃতি, পরিচয় আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। পদ্মার ভাঙন কেবল মাটি কেড়ে নেয় না, মানুষের ইতিহাসও মুছে দেয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যখন হাজারো মানুষ একটি স্থায়ী ঠিকানার নিশ্চয়তা পায় না, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়। উন্নয়নের মহাসড়কে তাদের জন্য কি সত্যিই কোনো জায়গা আছে?
আশফাকুর রহমান রাসেল
গণমাধ্যম ও সামাজিক কর্মী
marr.llb@gmail.com







