সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবরেও আমের হাট, বারোমাসি বাজারের পথে কানসাট

মোহা. সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)
এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম আমবাজার হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট আমবাজারে সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবরের শেষ দিকেও চলছে আমের বেচাকেনা। একসময় সেপ্টেম্বর মাসের পর এ বাজারে আম কেনাবেচা বন্ধ হয়ে গেলেও এখন উন্নত জাতের আম চাষ ও আধুনিক পরিচর্যা পদ্ধতির কারণে দীর্ঘায়িত হচ্ছে বাজারের কার্যক্রম। এতে কানসাট আমবাজারকে বারোমাসি বাজারে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন চাষিরা।
কাটিমন ও কল্যাণভোগের মতো জাতের আম বছরে একাধিকবার উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ায় বাজারে আমের সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকছে। পাশাপাশি মৌসুমের শেষ দিকে আমের চাহিদা ও দামের কারণে লাভের আশাও করছেন চাষিরা। তবে সব জাতের আম সারা বছর পাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তা।
সরেজমিনে কানসাট আমবাজারে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিরা আম নিয়ে আসছেন। গোমস্তাপুর থেকে আসা আমচাষি আকবর আলী সাত ক্যারেট কল্যাণভোগ আম বিক্রির জন্য এনেছেন। তাঁর দাবি, এসব আমের ওজন প্রায় তিন মণ। প্রতি মণ আমের দাম ২০ হাজার টাকা চাইলেও ক্রেতারা ১৬ হাজার টাকা প্রস্তাব করছেন। মণপ্রতি ১৮ হাজার টাকা পেলে তিনি বিক্রি করবেন।
আকবর আলী জানান, তাঁর বাগানে আরও ৩০ ক্যারেট বা প্রায় ১৫ মণ আম রয়েছে, যা আরও এক মাস পর্যন্ত পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন। লেখাপড়া শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে আম চাষে মনোযোগী হয়েছেন তিনি। ১৬ বিঘা জমি বার্ষিক বর্গা নিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে কাটিমন ও কল্যাণভোগ আমের চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন। বাগানে থাকা অবশিষ্ট আম বিক্রি করে আরও প্রায় আড়াই লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন।
তিনি বলেন, তাঁদের পরিবার প্রায় ৪০ বছর ধরে আম চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আগে আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে কাঙ্ক্ষিত লাভ করা যেত না। এখন উন্নত পরিচর্যা পদ্ধতির মাধ্যমে আম চাষের সম্ভাবনা বেড়েছে। একজন সফল আমচাষি হওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তাঁর মতে, বাগানের পরিচর্যার ওপর নির্ভর করে বছরে একাধিকবার আম উৎপাদন করা সম্ভব।
শিবগঞ্জ উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের আমচাষি আব্দুল করিম ১০ ক্যারেট বা প্রায় পাঁচ মণ আশ্বিনা আম নিয়ে বাজারে এসেছেন। প্রতি মণ আমের দাম ১০ হাজার ৫০০ টাকা চাইলেও ক্রেতারা ৯ হাজার টাকা প্রস্তাব করছেন। তিনি জানান, মণপ্রতি ১০ হাজার টাকার কমে আম বিক্রি করবেন না। তাঁর বাগানে আরও ৩০ ক্যারেট বা প্রায় ১৫ মণ আশ্বিনা আম রয়েছে, যা অন্তত ১৫ দিন পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন।
আব্দুল করিম বলেন, আম উৎপাদনে মণপ্রতি প্রায় চার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তাঁর বাগানে বছরে তিনবার আশ্বিনা আম উৎপাদিত হয়। তবে এ জন্য উপযুক্ত সময়ে বাগানের পরিচর্যা করতে হয়।
এদিকে শিবগঞ্জ বাজারের আমচাষি টিটো ১৫ ক্যারেট কাটিমন আম নিয়ে কানসাট বাজারে এসেছেন। তিনি প্রতি মণ আমের দাম ১৫ হাজার টাকা চাইলেও ক্রেতারা সাড়ে ১২ হাজার টাকা প্রস্তাব করছেন। কয়েক দিন আগে তিনি প্রতি মণ আম ১২ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। এবার আরও বেশি দাম পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
টিটো জানান, চলতি বছর প্রথমবারের মতো ৩৫ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের চাষ করেছেন। প্রথম বছর হওয়ায় ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তবে আগামী বছর ফলন বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। তাঁর মতে, যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে কাটিমন আম বছরে তিনবার উৎপাদন করা সম্ভব।
তবে আমচাষিরা সারসংকটের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, ডিএপি সারসহ বিভিন্ন ধরনের সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় আম চাষে সমস্যা হচ্ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া বলেন, কাটিমন আম সারা বছরই পাওয়া যাচ্ছে। কল্যাণভোগ আমও কাটিমনের মতো চাষ করা হচ্ছে। তবে আশ্বিনা আম দীর্ঘ সময় পাওয়া গেলেও সারা বছর পাওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গে আম উৎপাদনে শিবগঞ্জ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এখানকার বাজারে দীর্ঘ সময় আম পাওয়া যাচ্ছে এবং ভালো দামও মিলছে। আম চাষ ও ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী মানুষের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। আমচাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে ইউনিয়ন পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
কানসাটের আমবাজারের এই পরিবর্তন স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সারা বছর আমের সরবরাহ নিশ্চিত করতে উন্নত চাষপদ্ধতি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং কৃষকদের কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



