
মোঃ সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে উড্ডয়নের চেষ্টা করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই সাহসী বীরের আত্মত্যাগ তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। আজ ২৯ অক্টোবর তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী।
১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোডের ১০৯ নম্বর বাড়ি ‘মোবারক লজে’ জন্মগ্রহণ করেন মতিউর রহমান। তাঁর বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ এবং মা সৈয়দা মোবারকুন্নেছা খাতুন। তাঁদের পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামে।
শৈশব থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন মতিউর রহমান। তিনি ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে পাকিস্তানের সারগোদা এয়ার ফোর্স পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। বিমান চালনার প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৬১ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে ফ্লাইট ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৬৩ সালের ২৩ জুন পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৭ সালের ২৩ জুলাই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত মতিউর রহমানের মনও দেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল হয়ে ওঠে। ছুটিতে দেশে এসে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর উদ্যোগে স্থানীয় তরুণদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে দেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার জন্য তাঁকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে হতো।
সেই লক্ষ্যেই ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তানের করাচির মাশরুর বিমানঘাঁটিতে এক দুঃসাহসিক উদ্যোগ নেন তিনি। প্রশিক্ষণ বিমান টি-৩৩ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন। এ সময় প্রশিক্ষণার্থী পাইলট রাশেদ মিনহাজের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে বিমানটি পাকিস্তানের সিন্ধু অঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়। প্রাণ হারান মতিউর রহমান ও রাশেদ মিনহাজ। তখন মতিউর রহমানের বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর।
মতিউর রহমানের এই উদ্যোগ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে নেওয়া এক ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁর পরিকল্পনা সফল হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে বিমান চালনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু সেই সুযোগ আর আসেনি। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর আত্মত্যাগ পরবর্তী সময়ে জাতির কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।
বাংলাদেশ সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ মতিউর রহমানকে মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে। তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন।
দীর্ঘদিন পাকিস্তানে সমাহিত থাকার পর ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন ২৫ জুন রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনরায় সমাহিত করা হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে যশোরে বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটি’।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জীবন কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবনের গল্প নয়; এটি দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তিনি জীবন দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন ও দেশপ্রেম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা জোগাবে। ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে এই বীর সন্তানকে।



