চাঁপাইনবাবগঞ্জশিবগঞ্জসংবাদ

শিবগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা পাগলা নদীর ঐতিহ্য

শফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ :
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া পাগলা নদী— এক সময়ের খরস্রোতা, প্রাণবন্ত ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর নদীটি আজ অস্তিত্ব হারানোর দ্বারপ্রান্তে। ভারতের মালদহ জেলার মহদিপুর এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে এই নদী প্রবেশ করেছে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নের শেষ প্রান্ত দিয়ে। এখান থেকে শুরু হয়ে সদর উপজেলার কালিনগর ফাটাপাড়া এলাকায় এসে এর শেষ প্রান্ত গঠিত হয়েছে। নয়টি ব্রিজ ও ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটির তীরে এক সময় ছিল মাছ ধরা, নৌকা বাইচ, ধান নৌকায় পরিবহনের সরগরম দৃশ্য। আজ সেই নদী প্রায় মৃতপ্রায়।

দখল ও দূষণে শ্বাসরুদ্ধ নদী

বর্তমানে নদীর দুই তীর দখল হয়ে গড়ে উঠেছে শত শত ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বাজার। কোথাও কোথাও নদীর বুকে ফসল চাষ হচ্ছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দুই প্রান্তে পানি প্রবাহ বন্ধ থাকায় নদীর গভীরতা কমে গেছে এবং খরস্রোতা নদীটি এখন মৌসুমি খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষাকাল ছাড়া নদীতে পানি থাকে না বললেই চলে।

শ্যামপুর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামের প্রবীণ জেলে জয়নাল আবেদীন (৭০) বলেন, “আগে এই নদীতে ঢেউ খেলতো, পানিতে ছিল শৈবাল, দলে দলে মাছ। পিয়ালী, বায়াম, গুচি, সোল, গজার, চিংড়ি, বেলে, চাং— কী মাছই না ছিল! এখন তো শুধু শুকনো বালু আর গন্ধ।”

একই গ্রামের আরেক জেলে আব্দুর রাজ্জাক জানান, একসময় সকালে নদীর পাড়ে ফুয়াড়ী জাল, টাকজাল, ছিপ, চোঙ্গা, ডালি, দহি, হোচ্চা ইত্যাদি হাতে নিয়ে জেলেরা সারিবদ্ধভাবে মাছ ধরতেন। “এখন আর জেলেদের দেখা মেলে না। নদী মরে গেছে, আমাদের পেশাও মরে গেছে,”—বলেন তিনি।

পদ্মার সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্নতা

স্থানীয়রা জানান, এক সময় বন্যার সময় পদ্মা নদীর পানি পাগলা নদীতে ঢুকে মাছ ও পুষ্টির প্রবাহ সৃষ্টি করত। কিন্তু পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে নির্মিত বাঁধের কারণে এখন সেই সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। ফলে বন্যার পানি বা মাছ পাগলা নদীতে প্রবেশ করতে পারে না।

অন্যদিকে, ভারতীয় অংশে— অর্থাৎ মালদহ জেলার মহদিপুর সীমান্তে— ভারত সরকার বিশেষ বাঁধ নির্মাণ করে নদীর মুখে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে উজান থেকে পাগলা নদীতে আর কোনো পানি প্রবেশ করতে পারে না। ফলে নদীটি আজ জলবিহীন, প্রাণহীন এক মৃতধারায় পরিণত হয়েছে।

অপরিকল্পিত খননে হারিয়েছে জীববৈচিত্র্য

২০২১ সালে পাগলা নদীতে খননকাজ চালানো হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, তখন কোনো পরিবেশগত সমীক্ষা বা জলজ উদ্ভিদের সংরক্ষণ পরিকল্পনা ছাড়া খনন করা হয়। এতে নদীর প্রাকৃতিক শৈবাল বা দল মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়, যা ছিল নদীর জীববৈচিত্র্যের মূল উৎস।

শ্যামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, “খননের সময় নদীর নিচে থাকা শৈবাল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। সেই সঙ্গে নদীর তীর কেটে বালি ফেলা হয় নদীর মাঝখানে, এতে পানির গতি বন্ধ হয়। শৈবাল না থাকলে মাছ জন্মায় না— এটাই বাস্তবতা।”

তিনি আরও বলেন, “নদীর তীরে ক্যারেন্ট সুতা দিয়ে তৈরি ভুত জাল, আড়কী জাল, ক্যাপা জাল, রিন জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা না গেলে মাছের বংশবিস্তার অসম্ভব হয়ে পড়বে।”

প্রশাসনের উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা

শিবগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্চয় কুমার জানান, “নদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার রোধে বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। কিছুটা সাফল্য এসেছে। কয়েকটি এলাকায় নদী তীর দখলমুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু নদীর দুই প্রান্তে পানি প্রবাহ নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো ফল আসবে না।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবিব বলেন, “পাগলা নদীকে টিকিয়ে রাখতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ২০১৯ সালে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে নদীর কিছু জায়গা দখলমুক্ত করেছে। পরে ২০২১ সালে খননও করা হয়েছে।”

তিনি জানান, “নদীটি আর পুরোপুরি মৃত নয়। এখন আমাদের লক্ষ্য হলো নদীর পানির ধারাবাহিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং পদ্মার সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করা। এতে বৃষ্টির পানি জমে থাকবে, শৈবাল বা জলজ উদ্ভিদ আবার গজাবে, আর নদী ফিরে পাবে তার আগের রূপ।”

আহসান হাবিব আরও জানান, “পাগলা নদী পুনরুদ্ধারের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়নে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি যদি ৫০ কোটি টাকার নিচে থাকে, তাহলে তা সদর দপ্তরে পাঠানো হবে অনুমোদনের জন্য। অনুমোদন পেলে নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার, তীর রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

নদীর সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের সম্পর্ক

পাগলা নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি ছিল স্থানীয় মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি ও আবেগের প্রতীক। বর্ষার সময় পালতোলা নৌকায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হতো। নদীর ঘাটে নৌকা বাইচ, মেলা ও পাড়ে সন্ধ্যায় আড্ডা ছিল গ্রামীণ জীবনের অংশ। নদী হারানোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই সামাজিক বন্ধন ও সংস্কৃতিও।

বাজিতপুরের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, “আগে নদীর তীরের জমিতে সেচের কোনো চিন্তা ছিল না। নদীর পানি দিয়েই চাষ হতো। এখন টিউবওয়েল ছাড়া উপায় নেই।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

স্থানীয় পরিবেশবিদরা বলছেন, নদীর মৃত্যু মানে একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। নদীর পানিতে থাকা শৈবাল, পোকামাকড় ও ছোট মাছ ছিল কৃষির জন্যও উপকারী। নদী শুকিয়ে গেলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়, ফলে খরার প্রকোপ বাড়ে।

আশা এখনো টিকে আছে

সবকিছুর পরেও স্থানীয়দের আশা, সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তরিক উদ্যোগ থাকলে পাগলা নদী আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। জেলে, কৃষক ও সাধারণ মানুষ সবাই চান নদীটির পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হোক।

বাজিতপুর গ্রামের আব্দুল হান্নান বলেন, “আমরা চাই নদীতে আবার পানি বইবে, নৌকা চলবে, জেলেরা জাল ফেলবে— সেই দৃশ্য আবার ফিরুক।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিবের ভাষায়, “পাগলা নদীকে বাঁচানো শুধু সরকারি দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।”

নদীর বুকে যদি আবার শৈবাল জন্ম নেয়, জেলে যদি আবার হাসিমুখে জাল ফেলে— তবে হয়তো ইতিহাসের এই খরস্রোতা নদী আবার ফিরে পাবে তার প্রাণ, গৌরব ও ঐতিহ্য।


Related Articles

Back to top button