গোমস্তাপুরপ্রথম পাতা

রহনপুরে রেলওয়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি, মানবিক পুনর্বাসনের প্রশ্নও সামনে

সেখানে বসবাসরত সব মানুষকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করাও সমীচীন নয়। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ ও অসহায় পরিবারগুলোর অধিকার সুরক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে।

গোমস্তাপুর প্রতিবেদক:

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে রেলওয়ের জায়গায় গড়ে ওঠা রেলস্টেশনসংলগ্ন কেডিসিপাড়া (শান্তিপাড়া) বস্তিকে ঘিরে মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে উচ্ছেদের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে উচ্ছেদের দাবির পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ, বাসস্থান ও মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় আসছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৪০ বছর আগে রেলওয়ের জায়গায় গড়ে ওঠা এই বস্তিতে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ চলে আসছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বস্তি উচ্ছেদের দাবিতে গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, শ্রমিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠনসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। এ দাবিতে ইতোমধ্যে মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে সংসদ সদস্য, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তারা কেডিসিপাড়া উচ্ছেদের দাবি জানিয়ে বলেন, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান তাঁরা।

রহনপুর আম আড়তদার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ নির্মূল কমিটির গোমস্তাপুর উপজেলা আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন বলেন, তাঁদের লোকজনের ওপর হামলা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িতে হামলার ঘটনায় ৬২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের যথাযথ উদ্যোগের অভাবে মাদক কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ কারণে বস্তিটি উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

গোমস্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, বস্তিতে অপরাধপ্রবণতা কমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। সম্প্রতি ইউএনওর গাড়িতে হামলা ও ব্যবসায়ীদের মারধরের ঘটনায় থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রেলওয়ের জায়গা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। তারা প্রয়োজন মনে করলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কোনো খবর পুলিশের কাছে নেই।

এদিকে মামলার আসামিদের কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে।

উচ্ছেদের দাবির পাশাপাশি মানবিক প্রশ্নও জরুরি

তবে কেডিসিপাড়া উচ্ছেদের দাবির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করে আসা পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে? উচ্ছেদ করা হলে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষগুলো কোথায় যাবেন? তাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং জীবন-জীবিকার কী ব্যবস্থা হবে—এসব প্রশ্নও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

রেলওয়ের জায়গায় স্থাপনা গড়ে ওঠার বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করা যেমন জরুরি, তেমনি সেখানে বসবাসরত সব মানুষকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করাও সমীচীন নয়। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ ও অসহায় পরিবারগুলোর অধিকার সুরক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে উচ্ছেদের আগে প্রকৃত বাসিন্দাদের তালিকা তৈরি, নারী-শিশু ও অসহায় পরিবারের পরিস্থিতি যাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প আবাসন বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। কোনো পরিবার যেন হঠাৎ করে আশ্রয়হীন হয়ে না পড়ে, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সার্বিকভাবে রহনপুরের কেডিসিপাড়া সমস্যার সমাধানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত এবং রেলওয়ের সম্পত্তি অবৈধ দখলমুক্ত করার পাশাপাশি মানুষের মৌলিক অধিকার, বাসস্থান ও মর্যাদা রক্ষা করাও রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আইনের যথাযথ প্রয়োগের সঙ্গে মানবিক বিবেচনার সমন্বয় ঘটলেই এ সমস্যার একটি টেকসই সমাধান সম্ভব।

Related Articles

Back to top button