বিজ্ঞাপন
কৃষিপ্রথম পাতা

আম রপ্তানি ও সংরক্ষণে বড় পরিকল্পনা, বছরজুড়ে ফসল উৎপাদনে জোর কৃষিমন্ত্রীর


নিজস্ব প্রতিবেদক:

আম রপ্তানি সম্প্রসারণ, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, আমবাগানে বিকল্প ফসল চাষ এবং কৃষিপণ্যে আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সফরকালে কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে আধুনিক পদ্ধতিতে আদা, গ্রীষ্মকালীন কাঁচামরিচ ও টমেটো চাষ সম্প্রসারণ, আমবাগানসহ সম্ভাবনাময় কৃষি এলাকায় বহুমুখী ফসল উৎপাদনের বিষয়েও আলোচনা হয়।

আম রপ্তানির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদনকারী এলাকা। এ অঞ্চলের আম আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য জাপান, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও আম রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে আমের গুণগত মান, রোগবালাই ও পোকা মাকড়মুক্তকরণসহ নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।

তিনি বলেন, আমকে জীবাণু ও পোকা মাকড়মুক্ত করতে বিশেষায়িত মেশিনের প্রয়োজন। সরকার ইতিমধ্যে এ ধরনের মেশিন স্থাপন করেছে। আম পাকার আগেই এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আম প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করা সম্ভব হবে। আগামী মৌসুম থেকে আম রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো অনেকটাই দূর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আম সংরক্ষণে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা

আম সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে জাপানের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে বড় আকারের কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি আম উৎপাদনকারী জেলায় অন্তত ২০ হাজার টন ধারণক্ষমতার কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা গেলে আমের গুণগত মান ও স্বাভাবিক রং অক্ষুণ্ন রেখে কমপক্ষে তিন মাস সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে কৃষকদের একসঙ্গে সব আম বাজারে বিক্রি করতে হবে না। তাঁরা সুবিধাজনক সময়ে সংরক্ষিত আম বাজারজাত করতে পারবেন। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং ভোক্তারাও বছরের বিভিন্ন সময়ে আম খেতে পারবেন।

আমবাগানে আদা চাষের সম্ভাবনা

আমবাগানের অব্যবহৃত জমি কাজে লাগিয়ে আদাসহ বিভিন্ন বিকল্প ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, আমবাগানের ফাঁকা জায়গায় আদা চাষ করা সম্ভব কি না, তা সরেজমিনে দেখা হচ্ছে। এ জন্য মাটির ধরন ও কৃষি উপযোগিতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

কৃষকদের অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা বাস্তবে চাষাবাদ করেন এবং তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ

দেশে টমেটোর উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বছরে প্রায় এক লাখ টন টমেটো আমদানি করতে হয়। অথচ পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের চাহিদার বড় অংশ দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, যেসব এলাকায় তামাক চাষ হয়, সেখানে বিকল্প ফসল হিসেবে টমেটো উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। আবার যেসব এলাকায় বর্ষাকালে টমেটো উৎপাদন হয় না, সেখানে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে চারা রোপণ করে বর্ষা মৌসুমেও টমেটো উৎপাদন করা সম্ভব।

গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষে আগ্রহী কৃষকদের চারা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের সম্ভাবনাময় এলাকা ও আগ্রহী কৃষকদের চিহ্নিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কাঁচামরিচ আমদানি বন্ধের লক্ষ্য

কাঁচামরিচের আমদানি নির্ভরতা কমানোর বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আগামী মৌসুমে এক কেজি কাঁচামরিচও আমদানি করতে হবে না বলে তিনি আশা করছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে কৃষিপণ্য রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করতে চায় সরকার।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষিতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিকে রপ্তানিমুখী করা সম্ভব।

সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে

দেশে সারের সংকটের আশঙ্কা নাকচ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, সারের কোনো অভাব নেই। গত বছরের একই সময়ে দেশে সারের মজুত ছিল ১০ লাখ টন, চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে ১৩ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।

তিনি জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেশি পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কৃষকেরা যাতে সময়মতো সার পান, সে জন্য নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ডিলার নিয়োগ নিয়ে কারও অভিযোগ থাকলে তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে মন্ত্রণালয়ে জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখা হবে। সরকার চায় যোগ্য ও সঠিক ব্যক্তিরা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করবেন।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব

কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষকেরা যেন সারা বছর উৎপাদন করতে পারেন এবং তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ দাম পান, সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। কৃষিকে বারো মাস উৎপাদনমুখী করতে হবে। তবে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কিছুটা সময় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, একজন মন্ত্রীর পক্ষে সারা দেশের প্রতিটি এলাকার সমস্যা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোথাও অনিয়ম বা সমস্যা দেখা দিলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

কৃষিকে আরও উৎপাদনমুখী, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও রপ্তানিমুখী করতে কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন মন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন মাসুম

Related Articles

Back to top button