প্রথম পাতাপ্রসঙ্গ

এইচএসসি ফল বিপর্যয়: পরিসংখ্যানের আড়ালে সংকট

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফল জেলার শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। এবার জেলায় পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। মোট ৯ হাজার ৮২০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ হাজার ৭৬৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১৪৮ জন। ফলাফলে জেলার শিক্ষাব্যবস্থার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। বিশেষ করে কয়েকটি কলেজে পাসের হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে আসা উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অবশ্য এই হতাশাজনক ফলাফলের মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠানের সাফল্য আশাব্যঞ্জক। নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে জেলার সর্বোচ্চ ৮৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে নাচোলের এশিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৮৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। পুঠুরিয়া মহিলা কলেজেও পাসের হার ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ একই জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ফলাফলে রয়েছে বড় ধরনের বৈষম্য।

ফলাফলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা অনেক এগিয়ে রয়েছেন। জেলায় ৫ হাজার ৪১২ জন ছাত্র পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১ হাজার ৫৬১ জন। তাঁদের পাসের হার ২৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৪ হাজার ৪০৮ জন ছাত্রী পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ২ হাজার ২০৬ জন। তাঁদের পাসের হার ৫০ দশমিক ০৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ অর্জনেও মেয়েরা এগিয়ে। ছাত্ররা পেয়েছেন ৩৯টি, আর ছাত্রীরা পেয়েছেন ১০৯টি জিপিএ-৫। এই ব্যবধান শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষার পরিবেশ ও সহায়তার সুযোগ নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

তবে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করেছে কয়েকটি কলেজের ফলাফল। পার্বতীপুর এসবি আদর্শ কলেজে পাসের হার ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ, সাহাপাড়া পারভীন স্মরণী টেকনিক্যাল কলেজে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, নাচোল সরকারি কলেজে ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং নামোশংকরবাটী কলেজে মাত্র ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। রাধানগর বরেন্দ্র কলেজে পাসের হার আরও কম, মাত্র ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ভোলাহাট কলেজে মানবিক বিভাগের একজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এসব ফলাফল কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।

শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, মাদরাসা শিক্ষার ফলাফলও উদ্বেগজনক। জেলার ২৭টি মাদরাসার মধ্যে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান থেকে দুজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি হলো শংকরবাটি হেফজুল উলুম ফায়েজা খানম কামিল মাদরাসা। জেলার বাকি ২৬টি মাদরাসার কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেননি। অন্যদিকে ঝলঝলিয়া ইসলামী সমাজকল্যাণ আলিম মাদরাসায় ১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র একজন। কয়েকটি মাদরাসায় পাসের হার ২০ শতাংশেরও নিচে। সাধারণ ও মাদরাসা—উভয় ধারার এমন ফলাফল জেলার শিক্ষার সামগ্রিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ফলাফল বিপর্যয়ের দায় কার? শুধু শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা কিংবা পড়াশোনায় অনীহাকে দায়ী করে কি দায়িত্ব শেষ করা যাবে? শিক্ষার্থীদের সাফল্য-ব্যর্থতার পেছনে তাদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান, শিক্ষকসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন, শিক্ষকস্বল্পতা রয়েছে কি না, পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ হচ্ছে কি না এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তার ব্যবস্থা আছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ধারাবাহিকভাবে কম, সেগুলোর ক্ষেত্রে আলাদা মূল্যায়ন প্রয়োজন।

একই জেলার কোনো কলেজে পাসের হার প্রায় ৯০ শতাংশ, আবার কোনো কলেজে তা ১০ শতাংশের কাছাকাছি—এই বৈষম্যের কারণ অনুসন্ধান না করে কেবল ফলাফল প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, কোথায় পাঠদানের দুর্বলতা, কোথায় শিক্ষকস্বল্পতা কিংবা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা রয়েছে, তা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে চিহ্নিত করতে হবে। তবে তদন্ত ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষককে ফল বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করাও সমীচীন হবে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাহীন সুলতানা জানিয়েছেন, বিগত কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাটতি চিহ্নিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর এই বক্তব্য আশাব্যঞ্জক। তবে শুধু পর্যালোচনা কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

যেসব প্রতিষ্ঠানে ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে, সেগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শন করে পাঠদানের বাস্তব অবস্থা যাচাই করা দরকার। প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষকসংকট দূর করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম নিশ্চিত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদান এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তবে এই উদ্যোগ নিতে গিয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন উপেক্ষিত না হয়। যারা এবার উত্তীর্ণ হতে পারেননি, তাদের জন্য পুনরায় প্রস্তুতির সুযোগ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা সহায়তা এবং মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ফলাফল খারাপ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের হতাশা, আত্মবিশ্বাসের সংকট কিংবা শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

শিক্ষা কোনো প্রতিষ্ঠানের পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫-এর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জেলার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অগ্রগতির প্রশ্ন। তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের এবারের এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার ফলাফলকে কেবল হতাশার পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জেলার শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উদ্যোগ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

এখন প্রয়োজন দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা। শিক্ষার্থীদের যেমন নিজেদের প্রস্তুতি ও অধ্যবসায়ে মনোযোগী হতে হবে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রশাসনকেও নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হলে শুধু তাদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। তাই প্রশ্নটি শুধু কতজন পাস করল বা কতজন জিপিএ-৫ পেল, তা নয়; বরং কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারল না এবং তাদের সাফল্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টরা কী উদ্যোগ নিচ্ছেন—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের এবারের ফলাফল তাই সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা—শিক্ষার সংকটকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই।

লেখক: মোঃ সাজেদুল হক সাজু ,জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

Related Articles

Back to top button