প্রথম পাতাবিশেষ

মুঠোফোনে খবর, ফিকে হচ্ছে হকারদের জীবিকা

ছবি প্রতিকি

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। শহরের অলিগলি, বাজার কিংবা সড়কের মোড়ে মোড়ে একসময় শোনা যেত পত্রিকার হকারদের হাঁকডাক। কাঁধে কিংবা হাতে পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে ছুটে চলতেন তাঁরা। চায়ের দোকানে বসে এক কাপ চায়ের সঙ্গে সংবাদপত্র পড়া ছিল অনেকের প্রতিদিনের অভ্যাস। বাড়ির দরজায় পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকতেন পাঠকেরা।

কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের সংবাদ পড়ার অভ্যাসও। এখন ঘুম থেকে উঠেই অনেকের হাত চলে যায় মুঠোফোনের পর্দায়। কয়েক সেকেন্ডেই পাওয়া যায় দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, ছবি ও ভিডিও। ফলে ছাপা সংবাদপত্রের প্রতি আগ্রহ কমছে, সংকুচিত হচ্ছে বিক্রির বাজার। আর সেই পরিবর্তনের অভিঘাতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্র বিক্রেতারা।

৪১ বছরের পথচলা, তবু থামেনি দ্বীলিপের সকাল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সংবাদপত্র বিক্রেতা ববিউল ইসলাম রবু । জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন সংবাদপত্র বিলি করে। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সায় না দিলেও জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন ভোরে পত্রিকার বান্ডিল হাতে বেরিয়ে পড়েন তিনি।

পত্রিকা বিত্রেকা রবিউল ইসলাম রবু।

সকাল ৬টা থেকেই শুরু হয় তাঁর কর্মব্যস্ততা। এক পাঠকের কাছ থেকে আরেক পাঠকের কাছে হেঁটে পৌঁছে দেন প্রতিদিনের সংবাদ। দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটে পত্রিকা বিলি করতে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার হাঁটতে হয় তাঁকে। পত্রিকা বিলি শুধু একটি কাজ নয়, জীবনের দীর্ঘ অভ্যাসও। সময়ের পরিবর্তনে পাঠক কমেছে, বদলেছে পত্রিকা বিক্রির চিত্র। কিন্তু জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই তাঁকে বের হতে হয় সেই চেনা পথে।

বদলে গেছে খবর পড়ার অভ্যাস

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার বিভিন্ন বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও জনবহুল এলাকায় প্রতিদিন পত্রিকা পৌঁছে দেন সংবাদপত্র বিক্রেতারা। একসময় সকাল হলেই পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে তাঁদের ব্যস্ততা বেড়ে যেত। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে মানুষ এখন দ্রুত সংবাদ জানতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। কোনো ঘটনা ঘটার পর পরদিনের পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। স্মার্টফোনেই মুহূর্তে পাওয়া যায় সংবাদ, ছবি, ভিডিও ও তাৎক্ষণিক আপডেট।

অনেক পাঠক এখন শুধু শিরোনাম কিংবা সংক্ষিপ্ত সংবাদ পড়েই দিনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন। ফলে ছাপা পত্রিকার নিয়মিত পাঠক কমছে। এর প্রভাব পড়ছে পত্রিকার বিক্রির পরিমাণ, বিক্রেতাদের আয় এবং তাঁদের দীর্ঘদিনের পেশায়।

আয় কমেছে, বেড়েছে জীবিকার অনিশ্চয়তা

দীর্ঘদিন ধরে সংবাদপত্র বিক্রির সঙ্গে যুক্ত আব্দুল কাদের বলেন, বয়স্ক বিক্রেতাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বয়স বাড়লেও জীবিকার তাগিদে অনেককে প্রতিদিন পত্রিকার বান্ডিল হাতে পথে নামতে হচ্ছে। বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় পেশা পরিবর্তনের সুযোগও সীমিত। একসময় যে পেশার আয় দিয়ে সংসার চলত, সেই পেশাই এখন অনেকের কাছে অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কমিশনের ভিত্তিতে পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন মো. ইসমাইল হোসেন। তাঁর পেশাগত জীবনের শুরুতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ কপি পত্রিকা বিলি করতেন। তখন দৈনিক আয় ছিল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। পরবর্তী সময়ে পাঠকের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বেড়েছিল। সে সময় মাসে আয় হতো ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ছাপা পত্রিকার পাঠক কমে যাওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ১৬০ কপি পত্রিকা বিলি করেন তিনি। মাসিক গড় আয় নেমে এসেছে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকায়। আগের তুলনায় আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিবগঞ্জেও একই সংকট

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সংবাদপত্র বিক্রেতা আব্দুর রাজ্জাকের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তিনি বলেন, একসময় সকালে পত্রিকা নিয়ে বের হলে দ্রুতই বান্ডিল শেষ হয়ে যেত। এখন অনলাইনে খবর পড়ার প্রবণতা বাড়ায় পত্রিকার বিক্রি কমেছে, কমেছে আয়ও।

দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় যুক্ত থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন হেঁটে পত্রিকা বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আয় দিয়ে সংসার চালানোও কষ্টকর। বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় বাধ্য হয়েই তাঁকে এ পেশায় থাকতে হচ্ছে।

পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই

সাংবাদিক আব্দুর রব নাহিদ বলেন, পাঠকের কাছে এখন অনেক অপশন, চাইলেই মুঠোফোনেই পেয়ে যাচ্ছেন খবর। এর প্রভাব পড়ছে ছাপা পত্রিকার বাজারে। বিক্রি কমে যাওয়ায় বিক্রেতাদের আয়ও কমেছে। অথচ পত্রিকা সংগ্রহ, পরিবহন ও পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজগুলো করার পরও বিক্রি কমায় কমেছে আয়।

প্রযুক্তির বিস্তার ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের জনপ্রিয়তা সময়ের বাস্তবতা। এই পরিবর্তনকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদপত্র বিক্রির সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর জীবিকা যেন হারিয়ে না যায়, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্র বিক্রেতাদের কাছে এখন তাই সংকট কেবল পত্রিকার বিক্রি কমে যাওয়ার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের সংসার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের দীর্ঘদিনের পেশা টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েও যাঁরা প্রতিদিন ভোরে পত্রিকার বান্ডিল হাতে পথে নামেন, তাঁদের কাছে প্রতিটি সকাল এখন শুধু নতুন দিনের সূচনা নয়, জীবিকা টিকিয়ে রাখার আরেকটি সংগ্রাম।

Related Articles

Back to top button