বিজ্ঞাপন
For Advertisement: 01763639922
প্রথম পাতাপ্রসঙ্গ

শিশু কার কাছে এবং কোথায় নিরাপদ?

For Advertisement: 01763639922

শৈশবের বেড়ে ওঠার আনন্দ আর সব ভয়-শঙ্কা ভুলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ার একমাত্র ঠিকানা হওয়া উচিত শিশুর নিজের ঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পরম মমতা আর বিশ্বস্ততার চেনা ক্ষেত্রগুলো যখন কোনো শিশুর জন্য আতঙ্ক ও যন্ত্রণার অবরুদ্ধ কারাগারে পরিণত হয়, তখন তার আর যাওয়ার জায়গা কোথায় থাকে? যে স্বজন, শিক্ষক বা অভিভাবকের কাছে তার সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা পাওয়ার কথা ছিল, তিনি নিজেই যদি তার ওপর নেমে আসা নির্মম নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ান, তবে নিষ্পাপ শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে এক বিশাল প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

জাতীয় দৈনিকগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যায়, চেনা আঙিনায় শিশুদের ওপর নেমে আসা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের নিত্যদিনের চিত্র। ঢাকার পল্টনের ‘শারমিন একাডেমি’ নামে একটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার মাত্র সাত দিনের মাথায় চার বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষকদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। আবার ২০২৪ সালের এপ্রিলে গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি মাদ্রাসায় পড়া ভুল করার অপরাধে ১২ বছরের শিশু মাসুম হাসানকে হাত-পা বেঁধে বেত দিয়ে পিটিয়ে জখম করেন তার শিক্ষক। একইভাবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে রাজশাহীর বাগমারার ৫৫ নম্বর হাটগাঙ্গোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরির হাতে মারধরের শিকার হয় তৃতীয় শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও শ্রেণিকক্ষগুলো আজও অনেক শিশুর জন্য আতঙ্কের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

একই চিত্র ফুটে ওঠে মোবাইল চুরি বা দুষ্টুমির মতো সামান্য অজুহাতে শিশুদের ওপর নেমে আসা আদিম ও মধ্যযুগীয় নির্যাতনের ঘটনায়। ২০২১ সালের মে মাসে নরসিংদীর শিবপুরে দুষ্টুমির শাস্তির নামে ছয় বছরের এক শিশুকে গরুর সঙ্গে বেঁধে পিচঢালা সড়কে টেনেহিঁচড়ে নির্যাতন চালান তার নিজের চাচাতো মামা। বরিশালের বাকেরগঞ্জের নীলগঞ্জ গ্রামে মাত্র আড়াই হাজার টাকা দামের একটি মোবাইল ফোন চুরির মিথ্যা অভিযোগে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী জুই আক্তারের হাত-পা বেঁধে ও মুখে গামছা পেঁচিয়ে নির্যাতন চালায় প্রতিবেশীরা। কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা বাজারে ঘোড়ার গাড়ির ওপর হাত-পা বেঁধে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয় আট বছরের শিশু ফারুকের ওপর। অপরাধ বা দুষ্টুমি যা-ই হোক না কেন, শিশুদের প্রতি সমাজের এই নিষ্ঠুর প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে, তাদের জন্য বাইরের পরিবেশও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, যখন নির্যাতনকারী হন নিজের জন্মদাতা বাবা-মা কিংবা রক্তের সম্পর্কের পরম আত্মীয়রা। ঢাকার এক পরিবারের আড়াই বছর বয়সী শিশুকন্যা মেহেরিমা খান তাইয়েবার শরীরে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতনের একাধিক আঘাত দেখে লন্ডনপ্রবাসী বাবা বাসায় গোপনে ক্যামেরা স্থাপন করেন। সেখানে ধরা পড়ে, পরম মমতায় লালন করার বদলে জন্মদাত্রী মা নিজেই কীভাবে শিশুকন্যাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঝালকাঠিতে চার বছর বয়সী মাতৃহারা শিশু রাইসাকে তার নিজের বাবা ও সৎমা মিলে এমনভাবে মারধর করেন যে তার মাথার হাড় ভেঙে যায় এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটে। আবার পারিবারিক কলহ ও তালাকের সুযোগ নিয়ে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে নিজের পাঁচ মাসের শিশুকে মায়ের অজান্তে বিক্রি করে দেওয়ার মতো মানব পাচারের অমানবিক অভিযোগ ওঠে জন্মদাতা বাবার বিরুদ্ধে। এমনকি আত্মীয়দের মাধ্যমে শিশু পাচার বা বিক্রির ঘটনাগুলোও সামাজিক সুরক্ষার স্তম্ভ নাড়িয়ে দিচ্ছে।

আরও ভয়ংকর ও গভীরতর ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে নিজ গৃহে বা চেনা পরিবেশে পরম স্বজনদের হাতে ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতন ও শারীরিক নিপীড়নের ঘটনাগুলোতে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে নড়াইল সদর উপজেলায় সাত বছরের এক শিশু তার আপন চাচার দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়। রাঙামাটির মহিলা কলেজ এলাকায় খেলার মাঠ থেকে তুলে নিয়ে মাত্র সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তার আপন চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে। ঝালকাঠিতে সৎবাবার হাতে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার এক তরুণী পরবর্তীতে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এক প্রতিবেশীর দ্বারা দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হন। এসব ঘটনায় পরিবার ও স্বজনদের কেউ কেউ অপরাধ ঢাকতে নির্যাতনের শিকার শিশুটিকে চুপ করানোর অপচেষ্টা চালান। প্রতিটি ঘটনাই আমাদের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। শিশুর জন্য বিপদ কেবল রাস্তার অচেনা-অপরিচিত মানুষের কাছ থেকেই আসে না; অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিপদের ছায়া লুকিয়ে থাকে অতিপরিচিত, বিশ্বস্ত ও ঘরের মানুষের ছদ্মবেশে।

এমন অমানবিক ও দুঃখজনক ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের (UNICEF) বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সাম্প্রতিক গবেষণার ভয়াবহ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জনই প্রতি মাসে নিজ নিজ বাসাবাড়িতে কোনো না কোনো ধরনের মানসিক চাপ কিংবা সহিংসতার শিকার হয়। অর্থাৎ, শিশুর সবচেয়ে পরিচিত, আবেগের কারণে ঘনিষ্ঠ এবং সুরক্ষিত বলে বিবেচিত জায়গা হচ্ছে বাড়ি। কিন্তু নিজের ঘরও সব সময় তার জন্য নিরাপদ থাকে না। গৃহের আঙিনাতেই বহু শিশু স্বজনদের অনাকাঙ্ক্ষিত রাগ, শারীরিক শাসন ও কঠোর সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

এই জটিল প্রেক্ষাপটে শিশুদের কেবল পরিচিত বা অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে সাবধানে থাকার গতানুগতিক শিক্ষাই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। পাশাপাশি শিশুকাল থেকেই স্পষ্টভাবে শেখাতে হবে শারীরিক সীমানা ও সম্মতির শিক্ষা। শিশুকে শুরু থেকেই সচেতন করতে হবে যে পরিচিত বা অপরিচিত, যে-ই হোক না কেন, কারও অধিকার নেই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার শরীরের ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল অংশে স্পর্শ করার কিংবা শারীরিকভাবে নির্যাতন করার। কেউ তাকে অস্বস্তিকর বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো অনুভূতির মধ্যে ফেললে সে যেন জোরালো কণ্ঠে ‘না’ বলতে পারে। অন্যায় চাপ বা ভয় দেখিয়ে গোপন রাখার নির্দেশ দিলেও যেন মা-বাবা, শিক্ষক বা বিশ্বাসযোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কাছে গিয়ে তা প্রকাশ করার সাহস পায়। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বার্তাটি শিশুর মনে গেঁথে দিতে হবে—যেকোনো নির্যাতন বা অশুভ আচরণের জন্য শিশু নিজে কখনোই দায়ী নয়।

কিন্তু শিশুকে মুখ খোলার সাহস জোগানোর আগে প্রাপ্তবয়স্ক সমাজের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। কোনো শিশু যখন হঠাৎ জানায় যে সে অমুক স্বজনের কাছে যাবে না, তখন সামাজিক সৌজন্যতা বা আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে তাকে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া অনুচিত। সে যখন বলে কাউকে তার ভালো লাগে না, তখন তা সাধারণ চঞ্চলতা বা ছোটদের অভিমান ভেবে গুরুত্ব না দেওয়াটা বড় ভুল। শিশুর স্বাভাবিক আচরণে হঠাৎ নীরবতা, ভয় বা খিটখিটে ভাব দেখা দিলে অভিভাবককে গভীর মনোযোগ দিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ শিশু সব সময় বিপদের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না; অনেক সময় তার টানা নীরবতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় নীরব চিৎকার। আর শিশু যখন সাহস করে নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের কথা প্রকাশ করে, তখন সে এত দিন কেন বলেনি কিংবা ভুল দেখছে কি না—এ ধরনের প্রশ্ন তুলে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে না। বরং প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত, তার কোনো দোষ নেই এবং সে সাহস করে কথাটি বলেছে বলে তাকে ধন্যবাদ জানানো।

শিশুর সুরক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা কেবল একটি পরিবারের চার দেয়ালের ভেতরের দায়িত্ব নয়। এটি শিক্ষক, প্রতিবেশী, সচেতন সুশীল সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্রের সুসংগঠিত সম্মিলিত দায়িত্ব ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কোনো শিশুর কান্নার শব্দকে অন্যের পারিবারিক ব্যাপার বলে এড়িয়ে যাওয়া যেমন নৈতিক অপরাধ, তেমনি পরিবারের সম্মান রক্ষার মিথ্যা দোহাই দিয়ে নির্যাতিত শিশুর কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেওয়াও সমান অপরাধ।

নিরাপত্তার এই ধারণাটি কেবল ঘর বা সম্পর্কের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। শিশু মূলত সেই ঘরেই নিরাপদ, যেখানে তাকে অহেতুক ভয় দেখানো কিংবা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় না। সে সেই মানুষের কাছেই নিরাপদ, যে তার অকৃত্রিম সরল বিশ্বাসকে নিজের বিকৃত স্বার্থে ব্যবহার করে না। সে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ, যেখানে শিক্ষার মান যাচাইয়ের পাশাপাশি তার মনের আবেগ ও নিরাপত্তাকেও নিয়মিত গুরুত্ব দেওয়া হয়। সে সেই আধুনিক সমাজে নিরাপদ, যেখানে কোনো নিষ্পাপ শিশুর নীরব কান্না শুনে চারপাশের মানুষেরা নির্বিকার হয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় না।

আমাদের প্রশ্নটি কেবল একটি শিশু কোথায় নিরাপদ, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা চলে না। আসল প্রশ্নটি আজ সমাজ ও সভ্যতার প্রতিটি নাগরিকের নিজের বিবেকের কাছে তুলে ধরতে হবে। একটি শিশু কি আমার সান্নিধ্যে সম্পূর্ণ নিরাপদ? আমি কি তার কষ্টের কথা শুনে তা বিশ্বাস করার মানসিকতা রাখি? আমি কি তার অনীহা ও ‘না’ বলার অধিকারকে শ্রদ্ধা জানাতে পারি? কোনো বিপদের দিনে কি আমি তার সুরক্ষার ঢাল হয়ে সামনে দাঁড়াতে প্রস্তুত?

একটি শিশুকে নিরাপদে রাখার মূল অর্থ কেবল তাৎক্ষণিক শারীরিক আঘাত বা নির্যাতন থেকে তাকে বাঁচানো নয়; বরং তার পুরো আনন্দময় শৈশবকে বাঁচানো, সামাজিক অনুভূতির প্রতি তার প্রগাঢ় বিশ্বাসকে বাঁচানো এবং তার অনাগত ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্নগুলোকে টিকিয়ে রাখা। শিশুর প্রকৃত নিরাপত্তার সূতিকাগার তৈরি হয় একটি সহানুভূতিশীল ও সুরক্ষিত ঘর থেকে, কিন্তু তার সার্বিক নিশ্চয়তা ও সুরক্ষাবলয় বাস্তবায়িত হয় চারপাশে থাকা সৎ ও মানবিক ‘নিরাপদ মানুষ’ দিয়ে। আর সেই নিরাপদ মানুষটি হতে পারি আমি, আপনি এবং আমাদের সচেতন সমাজ।

লেখক:
আজমাল হোসেন মামুন
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

For Advertisement: 01763639922
For Advertisement: 01763639922

Related Articles

For Advertisement: 01763639922
Back to top button