শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক-যন্ত্রপাতি ও অ্যাম্বুলেন্স সংকট
দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী, বাড়ছে ভোগান্তি
মোহা: সফিকুল ইসলাম,শিবগঞ্জ :
আটরশিয়া গ্রামের জাহিদ হাসান জানান, জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে আলট্রাসনোগ্রাফি করতে বলা হয়। কিন্তু হাসপাতালে সেই সুবিধা না থাকায় এক নারী তাকে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানে এক হাজার টাকা ব্যয়ে পরীক্ষা করাতে হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন রামচন্দ্রপুরের খালেদা বেগম, সাহাপাড়ার সায়েমা বেগমসহ একাধিক রোগী। তারা বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার আশায় এলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
মনাকষার মৌসুমী বলেন, ঠান্ডা-জ্বর নিয়ে হাসপাতালে এসে কয়েকটি সাধারণ ওষুধ ছাড়া আর কিছু পাননি। অন্যদিকে রোকিয়া নামে এক নারী জানান, গাইনি চিকিৎসক না পেয়ে চিকিৎসা ছাড়াই ফিরে যেতে হয়েছে। এমন অভিযোগ করেছেন আরও অনেক রোগী।
হাসপাতালজুড়ে দালালচক্রের সক্রিয়তা
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশে কয়েকজন নারী-পুরুষ রোগীদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারীর সহযোগিতায় একটি দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, রোগী ক্লিনিকে নিয়ে গেলে কমিশন পাওয়া যায়। সেই অর্থ দিয়েই সংসার চালান তিনি। তার দাবি, এ ধরনের কাজে আরও বেশ কয়েকজন যুক্ত রয়েছেন।
জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট প্রকট
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৮১টি অনুমোদিত পদের মধ্যে বর্তমানে ৮৮টি পদ শূন্য। ৫১টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে ২৮টি শূন্য রয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির ৩৮টি পদের মধ্যে ২টি, তৃতীয় শ্রেণির ১৫৭টি পদের মধ্যে ৪৫টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ৩৫টি পদের মধ্যে ১৩টি পদ খালি রয়েছে।
হাসপাতালে মাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এছাড়া নেই আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, সেল কাউন্টার, সাকশন মেশিন, ডেন্টাল ইউনিট, অটোক্লেভ মেশিন, পর্যাপ্ত এসি ও ফ্রিজ। ফলে অনেক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সীমিত ওষুধ নিয়েও অভিযোগ
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের স্টোর থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন, টেট্রাসাইক্লিন, মেট্রোনিডাজল ও ওরস্যালাইনসহ সীমিত কয়েক ধরনের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। অনেক রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
যা বলছেন কর্তৃপক্ষ
শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. নাজির উদ্দিন বলেন, জনবল সংকট দূর করতে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু পদ পূরণ হয়েছে, বাকিগুলোও দ্রুত পূরণের চেষ্টা চলছে।
দালালচক্রের বিষয়ে তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আনসার সদস্যদের মাধ্যমে কয়েকজনকে হাসপাতাল এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের জন্য একটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, একটি সেল কাউন্টার, তিনটি ইসিজি মেশিন, চারটি এসি এবং দুটি ফ্রিজের চাহিদাপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাবুদ্দিন বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে। অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



