আলী আশরাফ স্যার: ভিন্ন চিন্তার বাঁশিওয়ালা

২০০৬ সালের এক শ্রাবণসন্ধ্যায় প্রথম দেখা হয়েছিলো স্যারের সাথে। সাক্ষাৎ খুব আরামদায়ক মনে হয়নি। বন্ধু সাদ্দামের সাথে ‘ই-কার’ বানান নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল সেইদিন। গিয়েছিলাম কম্পিউটার দেখতে হলো বির্তক। আমি ছিলাম এক নীরব দর্শক; কেবল পাশে বসে তাঁদের যুক্তি আর পাল্টা যুক্তি দেখছিলাম। যুক্তিবাদী- ভিন্নচিন্তার হালকাপাতলা গড়নের আলী আশরাফ বাবু (১১ জানুয়ারি ১৯৬৩-১৩ই আগস্ট ২০২৬) স্যারকে প্রথম দেখলাম। বন্ধু গিয়েছিল কম্পিউটার শিখতে, আর আমার তো শেখার চেয়ে যন্ত্রটা দেখার আগ্রহই বেশি ছিলো! সেই টানেই গিয়েছিলাম স্যারের বাড়ির নিচতলার সেই ছোট্ট ঘরটিতে, যেখানে বসে তিনি নিয়মিত সাহিত্যের আলাপ করতেন। কখনো কখনো চায়ের দোকানেও বসত স্যারের সাথে আড্ডা। আড্ডার বিষয় থাকতো না। যাকে বলে উন্মুক্ত আলোচনা তবে সমকালীন বিষয়ই প্রাধান্য পেতো।
প্রথম দিনের সেই উত্তপ্ত পরিবেশ দেখে ভেবেছিলাম, এ মানুষের কাছে আর আসা যাবে না! এত তর্ক, এত বিরোধিতা ভালো লাগে না। অদ্ভুতভাবে, কালের নিয়মে তাঁর এই বৈশিষ্ট্যটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠল।যাকে বলা যায় গঠনমূলক সমালোচনা। যেকোনো ভাবনার যে এক অন্য পিঠ থাকে,তা তিনি আলো ফেলে স্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারতেন। অন্ধ প্রশংসার মিছিলে সবাই যখন ক্ষমতার বন্দনায় ব্যস্ত থাকত, তিনি তখন বুক চিতিয়ে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিরোধিতা করতেন; তবে তা কোনো বিদ্বেষ থেকে নয়, শুধুই সমাজ আর ভাবনার বিকাশের তাগিদ থেকে।
তিনি শেখাতেন, সস্তা প্রশংসার জন্য কোনো মেধার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনার পেছনে চাই অতল পড়াশোনা। তাঁর মুখেই প্রথম শুনেছিলাম শারমিন আহমদের ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ বইয়ের গভীর আলোচনার কথা। রাজধানীর বড় বড় সাহিত্যিক, প্রগতিশীল চিন্তাধারা কিংবা সাহিত্য জগতের নতুন সব স্পন্দনের খবর তিনিই দিতেন আগে। কালের ভাষা পড়তে পারতেন পরম সূ²তায়। ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ার উপযোগিতা তিনি অনেক আগেই বুঝেছিলেন। আমাকে বলতেন, “লিখতে থাকো, নিয়মিত লেখো।” একদিন চায়ের আড্ডায় উনাকে আমার ‘লোকচিকিৎসা বৃত্তান্ত’ লেখাটা পড়ে শোনানোয় খুব প্রশংসা করেছিলেন। অন্য বড়ো কবিদের কবিতার পাশাপাশি আমার কবিতাও পড়তেন স্যার। মাঝে মাঝেই কবিতার দুটো পঙক্তি তুলে ধরে জিজ্ঞেস করতেন, “বলো তো, কোন কবির কবিতা?” কবিতার চেয়ে গদ্যে স্যারের আগ্রহ বেশি ছিলো। গানের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। নিজে শুনতেন, অন্যকেও শোনাতেন পরম যত্নে। রেডিও মহানন্দায় তাঁর সঞ্চালনায় ‘নিক্কণ’ নামের গানের অনুষ্ঠানটি সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। লোকসংগীতের ওপর আমার দুর্বলতা দেখে এই বিষয়ে আমার সাথে আলাপ করতেন। ভাবনা বিনিময় করতেন। কিছু বিষয় জানতেনও চাইতেন। মফস্বলের সেই ছোট্ট রেডিও স্টেশনেই তিনি ‘এই দিনে বিশ্ব’ নামে অনুষ্ঠান করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ‘চাঁপাই নবাবগঞ্জ টিভি’তে আমার উপস্থাপনায় দু’দুবার অতিথি হয়ে এসেছিলেন।একবার ইলা মিত্রকে নিয়ে, অন্যবার সিডো কনভেনশন ও নারী অধিকার নিয়ে। প্রতিবারই তাঁর সান্নিধ্যে নতুন কিছু শিখেছি।

একদিন মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠালেন: “তোমার সাথে অনেকদিন আড্ডা হচ্ছে না। কিছু লেখা নিয়ে চলে আসো না একদিন।” চাঁপাইনবাবগঞ্জ গেলেই তাই স্যারের বাড়ির ছাদ আমার প্রিয় জায়গা হয়ে উঠতো। পড়ন্ত বিকেলে স্যারের সাথে আড্ডা জমে উঠত বিশ্বরাজনীতি, দর্শন আর বইপত্র নিয়ে। ময়মনসিংহ বা ঢাকা থেকে নিয়মিত তাঁর জন্য বই পাঠাতাম। বেগম রোকেয়ার রচনাসমগ্রের তিনি ছিলেন অনুরাগী পাঠক; ফকির লালন শাহের আধ্যাত্মিক গানের বই কিংবা আর্য সারথীর ‘পরম ভাব ও আলাপ’ বইটির কথা জানতে চাইতেন। অরুন্ধতী রায়ের (জ. ১৯৬১) মুক্ত কলম ও সমাজের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত, ‘অনীক’ পত্রিকার পাতায় প্রগতিশীল চোখ, আর বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে তাঁর বিদগ্ধ বিশ্লেষণÑসব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক সমকালীন ভাবুক মানুষ।

প্রথমবার যখন তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন, আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু অপারেশনের পর যখন আবার ফিরে এলেন, আমরা আবার খুঁজে পেলাম সেই চিরচেনা, রসবোধে ভরপুর এক অনন্য মানুষকে। সেই প্রাণ খোলা হাসি মুখ। ভাবলেই চোখ ভিজে যায় এখন! কোথায় পাবো স্যারকে? হারিয়ে ফেলেছি সেই মানুষকে। মন ভার হয়ে আসে, চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।
তরুণদের নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার এই স্বার্থপর যুগে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও একাকী এক পথিকের মতো। নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে পথ দেখানোই ছিল তাঁর আসল আনন্দ। আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক তিনি ছিলেন না, আর বোধহয় সে কারণেই সম্পর্কের এই বন্ধনটা ছিল বন্ধুত্বের মতো সুদৃঢ়। আমার অসংলগ্ন যুক্তি শুনে যখন তিনি প্রখর পাল্টা যুক্তি দিতেন, নিজের অজ্ঞতা দেখে নিজেরই লজ্জা হতো! আর সেই হারই আমাকে ঠেলে দিত গভীর পড়াশোনা আর প্রাত্যহিক অধ্যয়নের টেবিলে। তরুণ নাহিদ ভাই যখন নতুন এক পত্রিকার স্বপ্ন দেখছিলেন, উনার মতো তেমন পরম বন্ধুর মতো পাশে কাউকে দাঁড়াতে দেখিনি।
তাঁর চেতনায় লালিত ছিল বামপন্থী আদর্শ। আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান, শাহরিয়ার কবির কিংবা আনু মুহাম্মদের লেখা নিয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করতেন। বিকল্প ভাবনার বীজ বপন করে দিতেন তরুণদের মনে। মফস্বলের আর পাঁচটা প্রবীণ মানুষের চেয়ে তিনি ছিলেন আলাদাÑকারণ জীর্ণ পুরোনোকে ধরে না রেখে নতুন ভাবনাকে তিনি গ্রহণ করতে পারতেন গুরুত্বের সাথে। এখন বুঝতে পারি তার কারণ। তিনি সমকালীন থাকতে চেয়েছেন সবসময়।
তিনি ছিলেন খাঁটি প্রগতিশীল। ধারণার লড়াইকে কখনো ব্যক্তি সম্পর্কের টানাপোড়েনে রূপ নিতে দেননি। ভিন্নমতের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। তিনি স্কুলে ইংরেজি পড়াতেন, কিন্তু নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে এতটাই কঠোর ছিলেন যে কখনো প্রাইভেট টিউশনকে বাণিজ্য বানাননি। নোট-গাইড আর কোচিং সেন্টারের এই যুগে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। এসব থেকে দূওে থেকেছেন সবসময় সেটা অবশ্য ভালোর জন্য। ভাবতে শেখাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
তিনি ছিলেন আমার কৈশোর ও যৌবনকালের সক্রেটিস,শিষ্যের কল্যাণ সাধনায় যিনি সদাপ্রস্তুত। কী রসময় ছিল তাঁর বলার ভঙ্গি! একজন লেখক হতে হলে কী করা উচিত, কীভাবে পড়া উচিত, প্রথম শ্রেণির লেখক কারা এবং তাঁরা কীভাবে বড় লেখক হয়ে উঠলেনÑতাঁর মুখ থেকে পরম মুগ্ধতা নিয়ে সেসব বয়ান শুনতাম। ভালো বই যেমন- ‘ডধৎ ধহফ ঢ়বধপব’ হয়তো বছরে অল্প বিক্রি হবে কিন্তু বিক্রি হতেই থাকবে। অন্যদিকে হঠাৎ জনপ্রিয় বই হয়তো একবছরই অনেক বিক্রি হবে কিন্তু পরে তার খোঁজ পাওয়া যাবে না। তাই তোমাকে বেছে নিতে হবে তুমি কোনটা চাও হঠাৎ সাময়িক সাফল্য নাকি দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রেখে যাওয়া। এছাড়া কীভাবে আমাদের ভেতর রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হবে, তা নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত কথা বলতেন। সে কথায় অবশ্যই রস থাকতো। মাঝে মাঝে আমরা হাসিতে ফেটে পড়তাম আর মনে মনে ভাবতামÑএক জীবনে যদি কোনো দিন তাঁর মতো একজন শিক্ষক হতে পারি, তবে মানবজনম ধন্য হয়ে যাবে!
তাঁর সেই বিদগ্ধ চিন্তার পেছনে লুকানো ছিল একটি শিশুসুলভ মন। হামিদ ভাই, সুফিয়ান ভাই কিংবা নাহিদ ভাইয়ের পাশাপাশি আমাকেও উনার মমতার চাদরে জড়িয়ে রাখতেন। পরম ভালোবাসায় বাড়ির ছাদে ফুটিয়েছিলেন হরেক রকমের ফুল। বাড়ির আগের ফাঁকা জমিটা চাইলে চড়া দামে ভাড়া দিতে পারতেন, কিন্তু তা না করে সেখানে ঠাঁই দিয়েছিলেন এক দরিদ্র নার্সারিওয়ালাকে। এতে পরিবেশের উপকার হলো, এক মেহনতি মানুষের কাজের সংস্থান হলো, আর প্রকৃতির রূপও যেন নতুন প্রাণ পেল।
শুধু দর্শন বা রাজনীতি নয়, প্রবীণ মানুষদের অধিকার নিয়েও তাঁর মন কাঁদত। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বরের সেই কনকনে শীতের রাতে ফেসবুকে লিখেছিলেন:
“প্রচন্ড ঠান্ডায় গতকালকে দরকারে বাধ্য হয়েছিলাম মোটরসাইকেল ভ্রমণে। হাত-পা ঠান্ডা বরফ করে গতকাল ৩টার সময় লেপে প্রবেশ করেছিলাম… আজ শিরশির কোমর-ঘাড় ব্যথা নিয়ে ১০টার সময় লেপ থেকে বের হলাম আবার মোটরসাইকেল ভ্রমণের জন্য! তবে এবার মনের টানে! বহু আকাক্সিক্ষত ভবন উদ্বোধনে থাকবো না, তা কি হয়! আমি পোলাও খাই না, আজ উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পোলাও খেয়েছি তৃপ্তি সহকারেÑমহানন্দা প্রবীণ নিবাসের নতুন ভবনের দ্বার উদ্ঘাটন।”
শীতের কাঁপন একপাশে রেখে কেবল ভালোবাসার টানে প্রবীণদের সেই আশ্রয়ে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। বলতেন, “বাংলাদেশ তো সব ধর্মের মানুষের দেশ।” তাই ঈদের আনন্দ থেকে পূজার মন্ডপ,সবখানেই ছিল তাঁর অসংকোচ পদচারণা। মাথায় টুপি পরে মন্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে পোস্ট করতে তাঁর কখনোই কোনো দ্বিধা ছিল না। সাধারণ মানুষ যেখানে ইতস্তত করত, সেখানে তিনি এগিয়ে যেতে অমলিন হাসিতে।
তিনি শিখিয়েছিলেন স্রোতের প্রতিক‚লে সাঁতার কাটার শিল্প। বলতেন:
“স্রোতের বিপরীতে চলা যায়, তবে তার জন্য অবশ্যই স্রোতকে সমীহ করে চলতে হবে। একা সোজা দাঁড়িয়ে থাকলে স্রোত তো তোমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে! তাই সতর্ক থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
আমার অজস্র প্রশ্নের তিনি ছিলেন এক ধীরস্থির উত্তরদাতা। উনার কাছে শুধু পেয়েছি, ফেরতের খাতাটা চিরকাল শূন্যই থেকে গেল। মাঝে মাঝে মনে হতো তিনি যেন বাস্তবের এক ‘মিসির আলী’Ñযার প্রতিটি ভাবনায় কেবলই লজিক ও যুক্তির প্রাধান্য। জীবনের শেষ দিনগুলোতে ফরহাদ মজহারের ‘তিমির জন্য লজিকবিদ্যা’ বইটির প্রতি তাঁর আগ্রহ দেখেছি। এটা মনে হয় স্যারের যুক্তি প্রিয়তার লক্ষ্ণণ।
১৮ আগস্ট কোনো এক বিষন্ন দিনে তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে হারিয়েছিলেন। আর ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট, আমার চিন্তার সারথি চিরবিদায় নিলেন। তিনি চলে গেছেন ঠিকই, তবে ভিন্নচিন্তার আলোয় দাঁড়িয়ে জীবনকে দেখার যে নতুন চোখ তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন,তা আমৃত্যু আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে। আমাদেরও যেতে হবে, যেতে হয়। কারো কারো চলে যাওয়া শুধুমাত্র চলে যাওয়া নয় কিছু স্মৃতি এবং কাজ থেকে যায়। সেই পথেই আমাদেও হেটে চলা।
লেখক: গবেষক এবং শিক্ষক; jafourjkkniu@gmail.com

